শিশুর কন্সটিপেশন, কারণ ও প্রতিকার

কন্সটিপেশন বা কোষ্ঠকাঠিন্য আমাদের খুব-ই পরিচিত একটি শব্দ, যেকোনো বয়সেই আমরা এর মুখোমুখি হতে পারি। বড় থেকে ছোট যে কেও কন্সটিপেটেড হতে পারি। শিশুদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা হলে বেশ দুশ্চিন্তায় পরে যাই আমরা সবাই।

আমি নিজেই দীর্ঘদিন ধরে এর প্রতি অবহেলায় দারুণ যন্ত্রনার মধ্য দিয়ে গিয়েছি।

শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য বা কন্সটিপেশনের কথা যতবার ডাক্তারের কাছে বলতাম, (প্রথম দিকেযাদের দেখাতাম) ততবার তারা বলতো এটা খুব-ই সাধারণ আর নরমাল, বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সলিড শুরু করার পর এটা হতেই পারে। এভাবে দীর্ঘদিন ২দিন পর একদিন, বা ৩/৪ দিন পর একদিন যখন বাচ্চার পায়খানা হয়, এবং যখন হয় তখন বেশ কষ্ট হয়, তখনো ডাক্তার বলেছেন এটা নাকি নরমাল।

অনেকদিন পরে আমার বড় ছেলেকে নিয়ে এত সমস্যায় পরেছিলাম, শেষ পর্যন্ত হাস্পাতাল নিতে হয়েছিলো।

এখন এই সমস্যা থেকে আমার দুই ছেলেই মুক্ত আছে।

তাই আজ আমি এই বিষয়ে যা যা জেনেছি তা শেয়ার করবো, অনেকের কাজে লাগতেও পারে।

শিশুদের ক্ষেত্রে কন্সটিপেশন হলে অবহেলায় অনেক ভয়াবহ রুপ নিতে পারে, কারণ তারা তাদের অনুভূতি বা যন্ত্রনা প্রকাশ করতে পারেনা।



কন্সটিপেশন বলতে আমরা কি বুঝি?

কন্সটিপেশন বা কোষ্ঠকাঠিন্য বলতে আমরা বুঝি শিশুর পায়খানা হবেনা, আর পায়খানা করতে গেলে শিশু খুব কাঁদবে বা ফোর্স করবে।



কন্সটিপেশনের কারণঃ

১) খাবারে ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবারের পরিমান কম থাকা।

২) পানি বা অন্যান্য লিকুইড পরিমানের চেয়ে কম খাওয়া,

৩)পর্যাপ্ত পরিমানে শারীরিক এক্টিভিটিস না হউয়া,

৪) মাংস জাতীয় খাবার বেশি খেলে,

৫) ফাস্টফুড বেশি খেলে,

৬) পায়খানা করতে খুব কষ্ট বা ব্যাথা অনুভূত হলে ,
কারণ এতে শিশু অনেক সময়েই ভয়ে পায়খানা আটকে রাখে যা পরে কন্সটিপেশনে রুপ নেয়।

৭) মানসিক অস্থিরতা বা ভয়। এটা হয়, কারণ অনেক সময় শিশু রা মানসিক ভাবে অস্থির থাকলে বা ভয়ে থাক্লেও পায়খানা আটকে যেয়ে কন্সটিপেশন হতে পারে। এটা সাধারন্ত স্কুলে/ ডে কেয়ারে বা কোথাও বেড়াতে গিয়ে শিশুরা করে থাকে।

৮) পরিমানের বেশি গরুর দুধ খাওয়াও হতে পারে কন্সটিপেশনের কারণ।

৯) কোনো কোনো শারীরিক অসুস্থতা শিশুর কোলন বা রেক্টামে প্রভাব ফেলতে পারে এবং তাতে সে কন্সটিপেটেড হতে পারে।

১০) সাম্প্রতিক হওয়া কোনো সার্জারিও শিশুকে কন্সটিপেটেড করতে পারে।

কন্সটিপেশনের লক্ষণঃ

আপনি কখন বুঝবেন আপনার বাচ্চা কন্সটিপেটেড, বা কিভাবে জানতে পারবেন পায়খানা স্বাভাবিক না, আসুন কমন কিছু লক্ষণ জেনে নি-ইঃ

১) পায়খানা করার চাপ আসা স্বত্ত্বেও পায়খানা না হওয়া,

২) পেটে কামড়ে ধরে ব্যাথা করা,

৩) পেট আকারে বড় হওয়া বা ফুলে যাওয়া,

৪) পেটে গ্যাস হওয়া,

৫) ক্ষুধা কমে যাওয়া,

৬) বমি বমি ভাব হওয়া

আসুন কন্সটিপেশনের পুরো প্রক্রিয়াটি জেনে নি-ইঃ

আমরা যখন খাবার খাই তখন তা স্টমাক বা পাকস্থলিতে যায় এবং সেখানে গিয়ে খাবার গুলো ভেঙ্গে লিকুইড হয়। এই লিকুইড গুলো নাড়িভুড়ি দিয়ে ট্রাভেল করে এবং খাবারে থাকা সব দরকারী পুষ্টি উপাদান সব শরীরে পৌঁছে যেতে থাকে। আর যেগুলো দরকার নেই বা হজম হয়নি এমন লিকুইডগুলো পুপ বা পায়খানা হিসেবে কোলনে এসে জমা হয়। এই জমা হওয়া পর্যন্ত এটা লিকুইড থাকলেও এই পর্যায়ে এসে পানি আলাদা হয়ে বডিতে চলে যায়। আর পুপ আরো সলিড হতে থাকে।
এবারে পুপ কোলনের একেবারে নিচে বা শেষ মাথায় যাকে রেকটাম বলে সেখানে এসে জমা হয় এবং রেকটামে একটা মাসল থাকে আর এই পুপ যখন ওই মাসলকে প্রেশার দেয় তখন ব্রেইনে সিগনাল যায় যে েখন পুপ করতে হবে। আর শিশু বা ব্যাক্তি যখন টয়লেট এ যায় তখন সহজেই সেই পুপ বেড়িয়ে যায় , কিন্তু যদি মনে করে সে যাবে না, পুপ আটকে রাখবে বা স্কিপ করে তখোনো পানি কিন্তু ক্রমাগত বডিতে চলে যেতে থাকে আর এদিকে পুপ আরো শক্ত হতে থাকে। আর প্রতিনিয়ত খাবার থেকে একই প্রসেস এ পুপ তৈরি হয়ে রেক্টামে এসে জমতে থাকে এবং রেকটাম সাইজে বড় হতে থাকে। এরপর যদি সেই মানুষ বা শিশু বাথ্রুমে যায় ও তবুও এই শক্ত পুপ আর বের হয় না । আর এভাবে জমতে জমতে ট্র্যাফিক জ্যামের মত বিশাল এক ডেডলাইন তৈরি হয়ে যায়। একেই বলা হয় কন্সটিপিশন। রেকটাম বেলুনের মত, এটা প্রতিবার পাম্প করে ফুলে আবার হাওয়া ছেড়ে আগের শেইপে যায় ,কিন্তু কন্সটিপিশন হয়ে গেলে রেক্টাম অরিজিনাল সাইজ থেকে বড় হয়ে যাওয়া এই পাম্পের কাজটি ঠিকভাবে করতে পারেনা। এবং উইক হয়ে যায়। আর এই প্রক্রিয়া চলতে চলতে শিশু এক সময় আর পায়খানা করার চাপ ই বোধ করেনা, এই যে রেক্টাম এভাবে তাঁর স্বাভাবিক আকার হারায় তা আগের শেইপে আসতে অনেক সময়-ই ১ বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।

আসুন জেনে নি-ই কি কি করলে কন্সটিপিশন থেকে মুক্তি পেতে পারবো

  • কৌষ্ঠকাঠিন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা, প্রাথমিকভাবে এর চিকিৎসা হলো প্রচুর পানি , শরবত আর বেশি পরিমানে লিকুইড খাবার গ্রহন করা।
  • বেশি বেশি আশযুক্ত খাবার খাওয়া আর শাকসবজি খাওয়া।
  • নিয়মিত ব্যায়াম আর হাটাচলা করা,
  • বাচ্চার স্বাভাবিক সময়ে, স্বাভাবিক নিয়মে পায়খানা হচ্ছে। কিন্তু পায়খানার পরিমাণ অল্প হলে, অনেক বাবা-মা ভেবে বসেন, বাচ্চার বুঝি এই ধরনের সমস্যা হচ্ছে। তা মোটেই ঠিক নয়।
  • কোষ্ঠকাঠিন্য হোক বা না-হোক, কোনও অবস্থাতেই সেই বাচ্চারা, যারা মায়ের দুধ খাচ্ছে, তাদের স্তন্যপান বন্ধ করা যাবে না। অনেকে হয়তো ভাবেন, স্তন্যপানের কারণে কোষ্ঠকাঠিন্য হচ্ছে। এই ধারণা ঠিক নয়।

  • খুব কম সংখ্যক হলেও, এমন কিছু বাচ্চা পাওয়া যায়, যাদের খাদ্যনালীর সমস্যার কারণে মল পরিষ্কার হয় না। প্রাথমিক কিছু পরীক্ষা থেকেই এই সমস্যা ধরা পড়ে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, তাদের নিয়মমাফিক চিকিৎসা করাতে হবে।

  • বাচ্চা প্যাকেটের দুধ খেলে, তার পাউডার এবং পানির পরিমাণ যেন সঠিক অনুপাতে থাকে, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। বাচ্চার শরীরে যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।

  • বাচ্চাকে সারাদিন শুইয়ে রাখবেন না বা বসেও থাকতে দেবেন না। ওর সাথে খেলা করুন।

  • একদম ছোট বাচ্চার হাত-পা নাড়িয়ে খেলা করান বা পা দিয়ে সাইকেল চালানোর মতো করে একটু ব্যায়াম করিয়ে দিন।
  • বাচ্চা যদি হামাগুড়ি দিতে শুরু করে, তা হলে তাকে আরও হামাগুড়ি দেওয়ার জন্য উৎসাহ দিন। আরও একটু বড় হলে, সে যেন দিনে অন্তত এক ঘণ্টা হাঁটাচলা বা খেলাধূলা করে, সেদিকে নজর রাখুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top
0 Shares
Tweet
Share
Pin
Share